×

হাতবিহীন আয়েশার পা দিয়ে মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস—অদম্য ইচ্ছাশক্তির অনন্য গল্প ‘পায়ের ছাপ’ তথ্যচিত্রে

জন্ম থেকেই দুই হাতবিহীন আয়েশা আক্তার। দারিদ্র্য ও সামাজিক অবহেলার মাঝেও যার শৈশব কেটেছে কঠিন সংগ্রামে—এক সময় আর্থিক অনটনের কারণে বাবা তাকে সার্কাসে বিক্রি করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। সেই আয়েশাই আজ বাংলাদেশের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল প্রতীক। পা দিয়ে লিখে তিনি সদ্য মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের এই তরুণী।

আয়েশার দীর্ঘ প্রায় এক যুগের সংগ্রাম, অশ্রু ও সাফল্যের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’। চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় এবং সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা মল্লিকের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় তৈরি এই ২৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডের তথ্যচিত্রটি সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার পর সম্প্রচারিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে, কীভাবে শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়েও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল আয়েশাকে। তবে স্থানীয় এক শিক্ষক তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে সমাজ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। পরে ২০১২ সালে এসএসসি ও ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর তার জীবনে নতুন মোড় আসে চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত মোস্তফা মল্লিকের একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

সেই প্রতিবেদনের পর আয়েশা প্রথমবার ঢাকায় আসেন এবং ‘কিংবদন্তি অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন, সঙ্গে পান দুই লাখ টাকার অনুদান। সেই অর্থ দিয়ে তিনি নিজের টিনের ঘর পাকা করেন। পরবর্তীতে এক ফ্রান্স প্রবাসী ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় তার উচ্চশিক্ষা অব্যাহত থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে মাস্টার্সে প্রথম বিভাগ অর্জন করেন তিনি।

আয়েশার এই অর্জনকে অনুপ্রেরণামূলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ বি এম হারুন উর রশীদ, সাউথ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহফুজুল আজিজ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ মন্তব্য করেছেন, শহুরে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আর প্রত্যন্ত গ্রামের হাতহীন আয়েশার সাফল্যের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল—এটি অনেকের জন্য চোখ খুলে দেওয়ার মতো গল্প।

শিক্ষাজীবন শেষ করে আয়েশা এখন চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং পাশাপাশি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়াচ্ছেন। তবে অভাব-অনটনের বাস্তবতা এবং একটি স্থায়ী চাকরির প্রত্যাশা এখনো তার জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্যচিত্র প্রচারের পর চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঘোষণা দিয়েছেন, স্থায়ী চাকরি না হওয়া পর্যন্ত আয়েশাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা সম্মানী প্রদান করা হবে।

পরিচালক মোস্তফা মল্লিক বলেন, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে তিনি আয়েশার জীবনসংগ্রাম অনুসরণ করেছেন। তার মতে, আয়েশার গল্প প্রমাণ করে—জীবন জয় করতে হাত নয়, প্রয়োজন অটল ইচ্ছাশক্তি।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)