
মোঃ হানিফুর রহমান- দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার খানপুর দক্ষিণ শাহবাজপুর গ্রামে এখন যেন ছোটখাটো এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে এগোতেই দূর থেকে চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির এক প্রাণী। প্রথম দেখায় অনেকেই থমকে যান। কেউ অবাক হয়ে বলেন, “এটা কি সত্যিই গরু?” আবার কারও মনে হয় যেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোটখাটো হাতি। কালো-সাদা রঙের বিশালদেহী সেই ষাঁড়টির নাম ‘দিনাজপুরের মহারাজ’। বিশাল আকৃতি, রাজকীয় চলাফেরা আর ব্যতিক্রমী পরিচর্যার কারণে ইতোমধ্যে এলাকাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে সে।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় ষাঁড় প্রস্তুত করা হলেও ‘মহারাজ’ যেন তাদের মধ্যেও আলাদা। ফ্রিজিয়ান জাতের এই বিশাল ষাঁড়টির ওজন প্রায় ১ হাজার ২০০ কেজি বা ৩০ মণ। তার দৈহিক গঠন, উচ্চতা এবং শান্ত স্বভাব দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত মানুষ। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসছেন শুধু একবার ‘মহারাজ’-কে চোখের দেখা দেখতে।
মহারাজের মালিক লুৎফর রহমান পেশায় একজন গাড়িচালক। সাধারণ আয়ের মানুষ হলেও গবাদিপশুর প্রতি তার ভালোবাসা অনেক পুরোনো। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার বাড়ির পালিত একটি গাভী একটি বাছুর জন্ম দেয়। জন্মের পর থেকেই বাছুরটির গঠন অন্যদের চেয়ে বেশ আলাদা ছিল। শরীরের আকার, শক্তি এবং চঞ্চলতা দেখে তখনই লুৎফর রহমান বুঝতে পারেন, এই বাছুর একদিন বড় কিছু হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় বিশেষ যত্ন।
লুৎফর রহমান জানান, জন্মের পর থেকেই তিনি বাছুরটিকে নিজের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করেছেন। নিয়মিত পরিচর্যা, উন্নতমানের খাবার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বড় করা হয়েছে তাকে। ধীরে ধীরে বাছুরটি বিশাল আকার ধারণ করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে তার আকার এতটাই বড় হয়ে ওঠে যে এলাকার মানুষ বিস্মিত হতে শুরু করেন। পরে তার নাম রাখা হয় ‘দিনাজপুরের মহারাজ’।
মহারাজের খাবারের তালিকাও বেশ রাজকীয়। প্রতিদিন তার জন্য আলাদা খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়। শুধু খড় বা ঘাসে সীমাবদ্ধ নয় তার খাবার। লুৎফর রহমান জানান, প্রতিদিন তাকে ৮ থেকে ১০ ধরনের দানাদার খাবারের মিশ্রণ খাওয়ানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, গমের ভুসি, খৈল, ছোলা, খুদ, খেসারি ও বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান। পাশাপাশি প্রতিদিন ফলও খাওয়ানো হয় মহারাজকে। তার পছন্দের তালিকায় রয়েছে কলা, আপেল, মালটা ও অন্যান্য মৌসুমি ফল।
বিশাল এই ষাঁড়টির পেছনে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার টাকা ব্যয় হয় বলে জানান মালিক। গত পাঁচ বছরে মহারাজকে বড় করতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন তিনি। যদিও এত খরচের পরও লুৎফর রহমানের কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং মহারাজকে নিয়ে তার গর্বের শেষ নেই।
লুৎফর রহমানের ছেলে রিয়াজুল ইসলাম বাবু বলেন, “মহারাজ আমাদের কাছে শুধু একটি গরু নয়। সে আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো। আমরা তাকে খুব ভালোবাসি। প্রতিদিন তার যত্ন নেওয়া, গোসল করানো, খাবার খাওয়ানো—সবকিছু আমরা নিজের হাতে করি।”
তিনি আরও জানান, মহারাজের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ বা স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়নি। প্রাকৃতিক উপায়ে এবং পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমেই তাকে বড় করা হয়েছে।
মহারাজকে দেখতে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। শিশু, কিশোর, যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও আসছেন তাকে দেখতে। কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে থাকছেন। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসছেন মহারাজকে দেখাতে। স্থানীয় দোকানপাটেও বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। ফলে গ্রামজুড়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “এত বড় গরু আমি জীবনে দেখিনি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা হাতি দাঁড়িয়ে আছে। মহারাজ এখন পুরো এলাকার গর্ব।”
আরেক দর্শনার্থী শারমিন আক্তার বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহারাজের ছবি দেখে এখানে এসেছি। বাস্তবে দেখে আরও অবাক হয়েছি। এত সুন্দর আর বিশাল গরু সত্যিই বিরল।”
আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এবার মহারাজকে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন লুৎফর রহমান। তার আশা, এই বিশাল ষাঁড়টির দাম প্রায় ২০ লাখ টাকা উঠবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা যোগাযোগ শুরু করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে মহারাজকে বিক্রি করার কথা বলতে গিয়ে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, “অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করেছি। পরিবারের সদস্যের মতোই মায়া হয়ে গেছে। কিন্তু কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই তো এতদিনের প্রস্তুতি। ভালো দাম পেলে বিক্রি করব।”
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদকে ঘিরে বড় আকারের গরুর প্রতি মানুষের আগ্রহ নতুন নয়। প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির গরু আলোচনায় আসে। তবে ‘দিনাজপুরের মহারাজ’ তার ব্যতিক্রমী গঠন, বিশাল ওজন এবং রাজকীয় উপস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।
গ্রামের মানুষ বলছেন, মহারাজ শুধু একটি গরু নয়, এটি এখন বিরামপুরের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন মানুষের ভিড় আর কৌতূহলই তার প্রমাণ। আর মালিকের কাছে? মহারাজ যেন শুধু একটি ষাঁড় নয়, বহু বছরের শ্রম, ভালোবাসা আর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
