
হাওরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণে কাজ শুরু করেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সিলেট সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ তথ্য জানান। বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নেওয়া এ পরিকল্পনায় হাওরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ড. তিতুমীর উল্লেখ করেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল, পলি জমে পানি নিষ্কাশনে বাধা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু মানবিক সহায়তা নয়, হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে চাই। সেই লক্ষ্যেই কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
অতীতে হাওরাঞ্চলে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সেগুলো মানুষের প্রকৃত কল্যাণে কার্যকর হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, পলি জমে নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, অনেক স্লুইসগেট অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং জলাবদ্ধতা বেড়েছে।
ড. তিতুমীর বলেন, “রাষ্ট্র জনকল্যাণমূলক হলে মানুষের পাশে দ্রুত দাঁড়াতে হয়। আমরা সেই দায়িত্ব পালনে কাজ করছি।”
তিনি জানান, সাম্প্রতিক অকাল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তালিকাভুক্ত পরিবারগুলোকে তিন মাস সহায়তা দেওয়া হবে।
হাওরাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ নয়, সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, নদী ও খাল খনন, জলমগ্ন ও ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, হাওর উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষিযন্ত্র সরবরাহ এবং সময়মতো শ্রমিক নিশ্চিত করার বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অকাল বৃষ্টির আগেই যাতে কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেন, সে জন্য উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি হারভেস্টার, ড্রায়ার ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের বহু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরাগায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে বিপুল পরিমাণ পরিযায়ী পাখি দেখা গেলেও বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
ড. তিতুমীর বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি রামসার সাইট। কিন্তু অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে এর বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, নতুন হাওর ও জলাশয়-সংক্রান্ত আইনের আওতায় কৃষি, মৎস্য, পানি সম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ ও স্থানীয় জ্ঞানকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ছিল লুটপাট ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক। ফলে টেকসই সমাধান হয়নি, বরং সংকট আরও বেড়েছে।
কৃষকদের জন্য সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে জানিয়ে ড. তিতুমীর বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা বীজ, সার, কীটনাশকসহ বিভিন্ন সেবা সহজে পাবেন এবং কৃষি পরিকল্পনাও আরও কার্যকর হবে।
মতবিনিময় সভায় সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
