×

শ্বেতপত্রের আলোকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতির ওপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে বর্তমান সরকার।’

আজ বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল এবং সেই কমিটি সমগ্র দেশের মানুষের সামনে একটি শ্বেতপত্র বা এই ধরনের একটি রিপোর্ট-হোয়াইট পেপার প্রকাশ করেছিল। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অর্থনীতির বিষয়টি। ওই পেপারটা যদি বের করে দেখেন, তাহলে মোটামুটিভাবে পরিষ্কার একটি চিত্র পাবেন।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার সেই পেপারটিকে সামনে রেখে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, পর্যায়ক্রমে সেসব পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করছে।’

প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি

প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত একটি কারণে হয় না। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সমস্যা তৈরি করে।’

তিনি বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতার বিষয়টি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দুর্বল ফিজিবিলিটি স্টাডি, প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন যথাযথ না হওয়া, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহিতা, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেট সামঞ্জস্যের ঘাটতি এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব সমস্যা সমাধানে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা, প্রকল্প প্রণয়ন ও সংশোধন সংক্রান্ত নির্দেশিকা সময়োপযোগী করা এবং চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি মনিটরিং জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে সমন্বয় জোরদার, নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পের বিলম্ব ও ব্যয়ের কারণ পর্যালোচনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেসব প্রকল্পের উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস, স্কোপ পরিবর্তন কিংবা চলমান রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ না করে সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিতামূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫ হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা

সাময়িক সংকটকালীন সময়ে শিল্প খাতে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খনন করা হবে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে।

তিনি জানান, সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ প্রণয়নের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা যায়।

পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূল বিবেচনায় গভীর সমুদ্রে সুবিধাজনক স্থানে জরুরি ভিত্তিতে নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও চলমান রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

ভোলার গ্যাস শিল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মেইনল্যান্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ভোলার গ্যাস ব্যবহার প্রসঙ্গে সুলতানা আহমেদের অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভোলায় যে গ্যাস রয়েছে, সেই গ্যাসকে যদি পাইপলাইনের মাধ্যমে মেইনল্যান্ডে নিয়ে আসতে চাই, তাহলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত সাত বছরের মতো সময় লাগবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা যেটি করতে চাচ্ছি তা হলো—সেখানে শিল্পকারখানা স্থাপন করা যায় কি না। এরই মধ্যে কিছু শিল্প উদ্যোক্তা সেখানে তাদের কারখানা স্থাপনের চেষ্টা করছেন, যেগুলো গ্যাস দ্বারা পরিচালিত হবে। এর ফলে একদিকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, অন্যদিকে ভোলা অঞ্চলের অর্থনীতির পরিধিও বৃদ্ধি পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ভোলার গ্যাস দেশের স্বার্থে সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ৫০০ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল সাড়ে ৩টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)