×

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও জবাবদিহি একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

রাখাইনে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবাসন একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, আইসিজে ও আইসিসিতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশ পুরোপুরি সমর্থন করে। কারণ রাখাইনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

আজ ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে ‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট: একটি সমন্বিত পদ্ধতির সন্ধান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বহুপাক্ষিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক কূটনীতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধানের পথ খুঁজতে চীন, আসিয়ান, জাতিসংঘসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ।

মাঠপর্যায়ের জটিল পরিস্থিতি তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা বর্তমানে মিয়ানমার রাষ্ট্রের প্রশাসনের বাইরে এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে তাতমাদাও ও আরাকান আর্মির চলমান সংঘাত অঞ্চলটিকে প্রত্যাবাসনের উপযোগী স্থানের পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

তিনি বলেন, এসব বিষয়ই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। তবে চ্যালেঞ্জ কঠিন হলেও তা অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় ধৈর্য ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে প্রত্যাবাসন সম্ভব। এটি ‘যদি’র প্রশ্ন নয়, বরং ‘কীভাবে’ ও ‘কত দ্রুত’ তা বাস্তবায়ন করা যায়—সেই প্রশ্ন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। এর মাধ্যমে দেশের কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একই সঙ্গে মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে। কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের উপস্থিতি মানবিক উদ্বেগের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়া যেমন বাংলাদেশের দায়িত্ব, তেমনি কক্সবাজারের মানুষের নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।

মানবিক সহায়তা থেকে প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে দ্রুত রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি যেন স্থায়ী রূপ না নেয়, সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।

আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি মোকাবিলায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশ সমন্বয় অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ ও পূর্বানুমানযোগ্য আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির জন্য চাপ অব্যাহত থাকবে। একটি আন্তর্জাতিক সংকটের ভার কোনো একক দেশের বহন করা উচিত নয়।

মিয়ানমারের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার আওতায় রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরির প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে সাড়া দিতে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব বিকল্প উন্মুক্ত রাখতে চায়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হতাশ না হয়ে নতুন দৃঢ় সংকল্প নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানান তিনি।

সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সম্মেলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এএসএম আলী আশরাফ, প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী, ফরেন সার্ভিস একাডেমির প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)