
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি নিরাপদ, মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি।
তিনি বলেন, “আমাদের জাতীয় জীবনে বাংলাদেশের আবহমান ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।”
আজ শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ‘তবু আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত তিনদিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় চেতনা ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। জাতীয় কবির জন্মদিনে আমরা অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বিভেদের গ্লানি দূর করার প্রত্যয় গ্রহণ করি। একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে নিজেদের উৎসর্গ করার অঙ্গীকার নিয়েই আমি এই উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করছি।”
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন, ১৯৭৬ সালে জাতীয় কবির জানাজায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অংশ নিয়েছিলেন এবং কবির লাশবাহী খাটিয়া বহনকারীদের অন্যতম ছিলেন। এছাড়া ১৯৭৯ সালে নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত র্যালিতেও তিনি অংশ নেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাতীয় কবির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, কাউকে সম্মান জানালে নিজের মর্যাদা কমে না; বরং বিনয় মানুষকে মহিমান্বিত করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর আবির্ভাব ছিল পরাধীন জাতির জীবনে আলোকবর্তিকার মতো। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও স্বপ্ন—সবকিছুতেই নজরুলের রচনা অনন্য মহিমায় উজ্জ্বল।
তিনি নজরুলকে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনাকারী হিসেবে অভিহিত করে বলেন, বিদ্রোহ, মানবতা, প্রেম, সাম্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিটি ক্ষেত্রে নজরুল অনন্য। তিনি নারী অধিকার ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণেও সোচ্চার ছিলেন।
দেশের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিবাদ শুধু মানুষের অধিকার ও দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করেনি, বরং বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিয়েছে। একই সঙ্গে মানবিকতা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
ঢাকার মিরপুরে এক কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি সমাজে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
প্রধানমন্ত্রী নজরুলের জীবন ও দর্শন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও পর্যটন বিভাগকে আহ্বান জানাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করতে পেরে সরকার গর্ববোধ করছে।
অনুষ্ঠানে তিনি মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহর অবদানের কথাও স্মরণ করেন, যিনি ১৯১৪ সালে নজরুল ইসলামকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
জাতীয় কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আগামী ২৫ মে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মাগফিরাত কামনা করছি।”
ত্রিশালের দরিরামপুরে নজরুল একাডেমি মাঠে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুর রহমান শিবলীসহ বিশিষ্টজনেরা।
