
সুন্দরবনঘেঁষা খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় আধুনিক পদ্ধতির মৌচাষ নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। নদীতীর ও খোলা জমিতে মৌবাক্স স্থাপন করে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কৃষকরা এখন নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে মধু উৎপাদনে ঝুঁকছেন। একসময় বননির্ভর মৌয়ালদের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মধু সংগ্রহ করতে হলেও বর্তমানে বনসংলগ্ন এলাকাতেই মৌচাষের মাধ্যমে একই ধরনের মধু উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়রার নদীপাড়বর্তী বিভিন্ন গ্রামে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন যুবক ও কৃষক মৌবাক্স স্থাপন করে নিয়মিত মধু সংগ্রহ করছেন। বনাঞ্চলে প্রবেশ ছাড়াই সুন্দরবনের ফুলের মধু আহরণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের মধ্যে এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
মৌচাষিদের ভাষ্য, মৌমাছিরা নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে বিভিন্ন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাক্সে জমা করছে। সম্প্রতি তারা প্রায় তিন মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে সুন্দরবনে কেওড়া ফুল ফোটা শুরু হওয়ায় উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশাবাদী তারা।
সাতক্ষীরা থেকে আসা একদল মৌচাষি বর্তমানে বানিয়াখালী গ্রামের নদীতীরে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। তাদের ৪০০টি মৌবাক্সের মধ্যে ১২০টি এখানে স্থাপন করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরম থেকে মৌমাছিকে সুরক্ষিত রাখতে বাক্সগুলোর ওপর খড় ও চটের বস্তা দিয়ে আচ্ছাদন দেওয়া হয়েছে।
কয়রার সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীর তীরেও একই দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে বসানো মৌবাক্স ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে মৌচাকের ফ্রেম ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হয়। পরে চাকগুলো আবার বাক্সে ফিরিয়ে দিলে মৌমাছিরা পুনরায় মধু সংগ্রহ শুরু করে।
মঠবাড়ি গ্রামের এক বাড়ির পেছনে কয়েকটি মৌবাক্স ঘিরে নারী-পুরুষকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়। তারা চাক থেকে ফ্রেম বের করে ব্রাশ দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে মেশিনের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করছেন।
মৌচাষি রিফাত হোসেন বলেন, “এই বাক্সগুলোই মৌমাছির ঘর। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুল থেকে তারা মধু এনে এখানে জমা করছে। এখন আর আমাদের বনের ভেতরে যেতে হয় না, বনসংলগ্ন এলাকাতেই নিরাপদে মধু সংগ্রহ করতে পারছি।”
তিনি জানান, তাদের ৪০০টি মৌবাক্স পরিচালনায় বছরে প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয় হয়। গত বছর এ খাত থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আয় হয়েছে। তবে ফুলের মৌসুম শেষ হলে মৌমাছিকে টিকিয়ে রাখতে চিনি খাওয়াতে হয়। প্রতিটি বাক্সে একটি রাণী মৌমাছি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্যথায় শ্রমিক মৌমাছিরা অন্যত্র চলে যায়।
কয়রার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন বলেন, এই উদ্যোগ সুন্দরবনের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি মৌয়ালদের ঝুঁকিও হ্রাস করছে।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “এটি স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছে। বনে প্রবেশ ছাড়াই সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরি হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনের ফুল, উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে বনসংলগ্ন এলাকায় উৎপাদিত মধুর স্বাদ ও গুণগত মান অন্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা ও উন্নত। এ কারণেই আধুনিক মৌচাষিরা সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপকূলকে মধু উৎপাদনের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
