×

আজ কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির জন্মদিন

বাংলাদেশের অভিনয়াঙ্গনের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে এক অনন্য সময়ের স্মৃতি। হুমায়ূন ফরীদি সেই বিরল শিল্পীদের অন্যতম। অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতা, শক্তিশালী কণ্ঠস্বর, সংলাপ উপস্থাপনের স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের অসামান্য ক্ষমতা তাঁকে বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

আজ ২৯ মে এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল হুমায়ূন কামরুল ইসলাম। পরবর্তীকালে হুমায়ূন ফরীদি নামেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অভিনয়জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৬৮ সালে ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখানেই নাট্যকার সেলিম আল দীনের সংস্পর্শে এসে নাটকের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্ম নেয়। এরপর মঞ্চনাট্যের সংগঠন ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয়জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন তিনি।

মঞ্চনাটকের অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিনয়ের সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করতে সহায়তা করে। আর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন।

আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তিনি শুধু চরিত্রে অভিনয় করতেন না, বরং চরিত্রকে নিজের ভেতরে ধারণ করে জীবন্ত করে তুলতেন।

তাঁর অভিনীত ‘সংশপ্তক’ নাটকের ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রটি আজও দর্শকের মনে অমলিন। এছাড়া ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘নিকষ অন্ধকার’ ও ‘শীতের পাখি’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

বিশেষ করে খলচরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি খলনায়কের চরিত্রকে শুধু ভয়ঙ্কর নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবধর্মী করে তুলেছিলেন। ফলে দর্শক একদিকে চরিত্রটিকে ঘৃণা করলেও অন্যদিকে তাঁর অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ হতেন।

চলচ্চিত্রেও তিনি রেখে গেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। নব্বইয়ের দশক থেকে বড় পর্দায় তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। ‘দহন’, ‘বাচ্চু বাদশাহ’, ‘সন্ত্রাস’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘মাতৃত্ব’ ও ‘জয়যাত্রা’সহ বহু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় সমাদৃত হয়।

‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৪ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।

পর্দার বাইরেও হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও স্পষ্টভাষী মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থান-পতন ও সংগ্রাম তাঁর জীবনকে যেমন প্রভাবিত করেছে, তেমনি তার ছাপ দেখা গেছে তাঁর শিল্পীসত্ত্বাতেও।

হুমায়ূন ফরীদিকে কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে মূল্যায়ন করলে তাঁর অবদানকে ছোট করে দেখা হবে। তিনি ছিলেন অভিনয়ের এক স্বতন্ত্র ধারা, এক চলমান বিদ্যালয়। সংলাপ, অভিব্যক্তি, নীরবতা ও বিরতির ব্যবহার—সবকিছুতেই তিনি রেখে গেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর।

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই গুণী শিল্পী। তবে তাঁর প্রস্থান বাংলা অভিনয়াঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা আজও পূরণ হয়নি। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর সৃষ্ট অসংখ্য চরিত্রে, স্মরণীয় সংলাপে এবং কোটি দর্শকের ভালোবাসায়।

×

শেয়ার করুন:

ডাউনলোড করুন (High Quality)