
জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, শেখ হাসিনার মাফিয়া শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গুম ও ভীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন, নির্যাতন, গুম ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের মানুষের মৌলিক বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনার শাসনামলের অমানবিকতার বর্ণনা দিয়ে স্পিকার আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশের মানুষ আর কখনো এ ধরনের বিভীষিকাময় গুম ও নিপীড়নের শিকার হয়নি।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের সঙ্গে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, এমপি এবং চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি উপস্থিত ছিলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দিশালা এবং ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনের দীর্ঘদিনের গুমের মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরেন। এ সময় ‘নিপীড়ন থেকে বিপ্লব: রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন উন্মোচন’ শীর্ষক ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর বিগত শাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক গুম ও দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়।
সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ‘আয়নাঘরে’ বন্দিজীবনের নির্মম অভিজ্ঞতা এবং গুম ও নিপীড়নের ভয়াবহ অধ্যায় তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, তাকে দীর্ঘ সাত মাস সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে চরম অমানবিক ও পদ্ধতিগত নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তিনি সেই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।
সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, “২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল আমার স্বামী ইলিয়াস আলীকে গুম করার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘গুম’ শব্দটি নতুন করে পরিচিতি পায়। তৎকালীন সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতেই ইলিয়াস আলীকে গুম করেছিল।” এ সময় তিনি বিচারবহির্ভূত গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ বক্তব্যে তৎকালীন সরকারের মাফিয়াতন্ত্র ও ভয়ের সংস্কৃতির তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
আইপিইউ মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বলেন, বাংলাদেশে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ড, গুম এবং বিরোধী মতাদর্শের অনুসারীদের ওপর নিপীড়ন অত্যন্ত অমানবিক ও জঘন্য। তিনি বলেন, তার জন্মভূমি রোমানিয়ায় নিকোলাই চসেস্কুর নির্মম দমননীতির সঙ্গে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারপ্রধানের শাসনামলের চরম মিল রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ সফর শেষে আইপিইউ-এর গভর্নিং বডির কাছে বিগত শাসনামলে দেশে সংঘটিত গুম, হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, জহরত আদিব চৌধুরী, মোছা. তাহসিনা রুশদীর, হুমাম কাদের চৌধুরী, মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, আনিসুর রহমান, সানজিদা ইসলাম, মাধবী মারমা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারা অংশ নেন।
