
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপরই তার সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে সরকারপ্রধান জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
আজ তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই নিরাপত্তার ঘেরাটোপ যেন সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়, সে বিষয়ে উন্নত ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে এসএসএফকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।’
এসএসএফ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার বা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমান সময়ে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ধরন অনেক বদলে গেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব মোকাবিলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ, কৌশলগত দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা অর্জন অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ‘একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে এসএসএফের পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।’
এসএসএফের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চার দশক আগে সময়ের প্রয়োজনে এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ১৯৯১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক সব সদস্যকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসএসএফের কার্যক্রমের সঙ্গে আমার পরিচয় নতুন নয়। তরুণ বয়স থেকেই আমি এই বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি।’
বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি এসএসএফের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময়ে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এবং জীবনের শেষ সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এসএসএফ অত্যন্ত আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে।
তিনি আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জানাজার আয়োজনেও এসএসএফ গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এসএসএফের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমি এসএসএফের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করছি এবং তাদের দায়িত্ব পালনের দক্ষতা দেখছি।’
যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে নিজের গাড়িবহরের আকার সীমিত করার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে দক্ষতা ও নিরাপত্তা কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসএসএফ সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি বলেন, ‘রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন জনসভা ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয়। ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এসএসএফকে কাজ করতে হয়।’
এসএসএফের নবনির্মিত আধুনিক ফায়ারিং রেঞ্জের উদ্বোধনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা আরও বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নিরাপত্তা কৌশল ও দক্ষতা উন্নয়নে এসএসএফ সদস্যরা এই সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবেন।
রেড বুকের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০২ সালের পর এসএসএফের ‘রেড বুক’ নতুন করে সংস্কার করে সময়োপযোগী করা হয়েছে, যা বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘এসএসএফের মতো বিশেষায়িত বাহিনীর জন্য সাহস, সততা, বিশ্বস্ততা, সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এবং চেইন অব কমান্ড মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের জাতীয় নিরাপত্তাও জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমন্বয় যত বেশি হবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও তত বেশি কার্যকর ও সুচারুভাবে পরিচালিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ ও আনসার বাহিনী থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের বাছাই করে এসএসএফ গঠন করা হয়। এরপর তাদের দেশ-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষ নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসএসএফকে আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলেও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, এসএসএফ প্রধান এবং বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
