
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, নদী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। এর সুফল পাবে ২৪ জেলার ১৬১ উপজেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাসসকে বলেন, পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি নদীকেন্দ্রিক অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিনের নাব্যতা সংকট ও সীমিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে পদ্মার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন আসবে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। প্রায় ২ লাখ হেক্টরের বেশি এক ফসলি জমি দুই ফসলি এবং ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির সরবরাহ নিশ্চিত হলে কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে এবং খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
কৃষি গবেষকদের ধারণা, পর্যাপ্ত সেচ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বোরো ধানের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৪.৫-৫ টন থেকে বেড়ে ৬-৭ টনে উন্নীত হতে পারে। একইভাবে গম, ভুট্টা ও আলুর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, পদ্মা পাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এ মেগা প্রকল্পের কাজ ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের মতে, প্রকল্পটির মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট দূর হবে এবং মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে। প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
এছাড়া অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ এবং দ্রুত নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষকে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। কৃষকের আয় গড়ে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের ফলে কৃষিযন্ত্র, বীজ, সার, কীটনাশক, পরিবহন ও বিপণন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। গুদামজাতকরণ, হিমাগার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নতুন গতি সঞ্চার হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা কাটিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
