
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, হাতির নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব হাতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, হাতি সংরক্ষণে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বন বিভাগের মাঠকর্মী, বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষার্থী, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। হাতির আবাসস্থল রক্ষা করা মানে শুধু হাতিকে রক্ষা করা নয়; এর মাধ্যমে বন, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং মানুষের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত হয়।
এবারের বিশ্ব হাতি দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘বার্নিং দ্য ওয়ার্ল্ড টুগেদার টু হেল্প এলিফ্যান্টস’ এবং বাংলা প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’। হাতি ও এর আবাসস্থল সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাতির নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য।
মন্ত্রী বলেন, একসময় দেশে প্রচুর হাতি থাকলেও বর্তমানে এ প্রাণীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে। আবাসস্থল দখল ও ধ্বংস, বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী অপরাধ হাতির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতির সংখ্যা ২৬৮টি, পরিযায়ী বন্য হাতি ৯৩টি এবং পোষা হাতি ৯৬টি। আগামী বছরের মধ্যে নতুন করে হাতি জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাতি সংরক্ষণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮-২০২৭)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে ৪০টি অগ্রাধিকার কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মানুষ-হাতি সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের ক্ষতিপূরণ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং জানমালের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, ২০১২ সাল থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত হাতির আক্রমণে নিহত ৩২২ ব্যক্তির পরিবার, আহত ১৬৯ জন এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত ৩ হাজার ২১৫টি পরিবারকে মোট প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তিনি বন অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেন।
মানুষ-হাতি সংঘাত মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, হাতি অধ্যুষিত এলাকায় এ পর্যন্ত ১৫৯টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। এসব দল হাতির আগমন সম্পর্কে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়া, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ উপায়ে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত কমাতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে হাতি সংরক্ষণ কখনোই টেকসই হবে না।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল তাঁর নির্বাচনী এলাকায় হাতির আক্রমণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় হাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাতি রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, হাতি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই বিপন্ন। হাতি সংরক্ষণে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরণ্যক ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আব্দুল মোতালেব হাতি সংরক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে হাতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
