
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রোগীদের প্রতি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক, মানবিক আচরণ এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের মাধ্যমেই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং রোগীদের প্রতি সহমর্মী মনোভাব অত্যন্ত জরুরি।
দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় হিসেবে চলে যাচ্ছে। এই অর্থ দেশে রাখার জন্য চিকিৎসকদের মানবিক আচরণ ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, মানুষের আস্থা আইন প্রয়োগ করে অর্জন করা সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের পেশাদারিত্ব, আন্তরিকতা এবং মানবিক আচরণই স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, জনগণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ও সেবা পৌঁছে দিতে সরকার সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী হেলথ কেয়ারার হবেন, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।
তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতালনির্ভর নয়; পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনও সুস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতির আলোকে সরকার স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো রোগ সম্পর্কে আগাম পরামর্শ এবং নিয়মিত পরীক্ষা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি জানান, চলতি জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু বাজেট বাড়ানো নয়, চিকিৎসা ব্যয় কমাতেও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে, যাতে রাজধানীর বাইরে শিশু চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হয়।
মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানসম্মত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, হাসপাতালগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন চিকিৎসকের আন্তরিক ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলিও একজন চিকিৎসকের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তব্যের শুরুতে ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও গণআন্দোলনের এক জীবন্ত ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনায় এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু দক্ষ চিকিৎসকই নয়, অসংখ্য শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও মানবসেবায় নিবেদিত মানুষ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন হয়। এ সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে কলেজের এক শিক্ষার্থীর আঁকা আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।
এর আগে সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত মতবিনিময়ে অংশ নেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজকে বিশ্বমানের আধুনিক গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। এছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চিকিৎসক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
