
গাইবান্ধার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর পানি গত এক মাস ধরে কখনো বাড়ছে, আবার কখনো কমছে। পানি ওঠানামার এ প্রবণতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। অব্যাহত ভাঙনে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও অসংখ্য বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। শেষ সম্বল হারিয়ে বাড়িঘর রক্ষার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
এদিকে, নদীভাঙন প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে নিয়মিত কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৪০ দিন ধরে জেলার নদ-নদীর পানি ওঠানামা করছে। এরই মধ্যে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার নিম্নাঞ্চল ও কাঁচা সড়ক প্লাবিত হয়েছে। এতে বোরো ধানের বীজতলা, আউশ, পাট, তিল এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার সাত উপজেলায় বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪৫ হেক্টর আউশ, ৩০ হেক্টর পাট, ২৫ হেক্টর তিল, ৮ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ১০ হেক্টর শাকসবজির আবাদ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের চকরহিমাপুর স্টেশনে ৯৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত জেলার কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
পাউবোর তথ্যমতে, পানি বৃদ্ধি শুরুর পর থেকে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৬টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। কয়েকটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া, বেলকা, চণ্ডীপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙনে শত শত বিঘা কৃষিজমি ও বহু বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চরাঞ্চলের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনাও ঝুঁকিতে রয়েছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী, কামারজানি ও মোল্লারচর ইউনিয়নেও ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুর ও উড়িয়া ইউনিয়নের কাঁটাতার এলাকায় এবং সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলেও নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশিমপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা জেলেখা বেওয়া বলেন, প্রতি বছর নদীভাঙনে সব হারাতে হচ্ছে। তিন বছর আগেই বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। অন্যের জায়গায় ঘর তুলে থাকলেও এবার সেই ঘরটিও নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
একই এলাকার আলেয়া বেগম জানান, কয়েক দিন আগে তার বাড়িও নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে তিনি দিনে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন এবং রাতে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেন। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মোল্লারচর ইউনিয়নের বাসিন্দা বদিদুজ্জামান বদি বলেন, পুরো ইউনিয়নই চরাঞ্চলে হওয়ায় প্রতিবছর একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়। ধীরে ধীরে ইউনিয়নটির অস্তিত্বই সংকুচিত হয়ে আসছে।
ফুলছড়ির রসুলপুর গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, নদীতে এখনো তেমন পানি না বাড়লেও কয়েকটি বসতভিটা ও শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি প্রতিনিধি এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। তিনি বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না, নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান চাই।”
সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া গ্রামের খুরশিদ মিয়া বলেন, প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনে চরাঞ্চলের কৃষিজমির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে আউশ, বোরো ধানের চারা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নদীর পানি ওঠানামার কারণেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। যেসব স্থানে বাঁধ নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরোধ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
