পলাতক আসামিদের দেশে ফেরাতে কোনো গাফিলতি করবে না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ বিদেশে পালিয়ে থাকা সব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনতে সরকার কোনো ধরনের গাফিলতি করবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে সরকার।
আজ জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধির আওতায় ঢাকা-১৪ আসনের বিরোধীদলীয় (জামায়াতে ইসলামী) সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
আলোচনা শেষে সংসদে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। পরে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে তা দ্রুত সংসদকে অবহিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন স্পিকার।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পলাতক আসামিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, একাধিক পাসপোর্ট রাখার অভিযোগ যাচাই এবং দেশে-বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার আইনের শাসন, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাবেক আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি জানান, বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজ করতে গত ৩০ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ‘হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সেন্ট লুসিয়ায় সাবেক আইজিপির অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উপযুক্ত সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গুম-হত্যার পরিসংখ্যান
২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ বিভিন্ন ঘটনায় ৭ থেকে ৮ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে।
তিনি জানান, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৮টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা ১৩৩টি।
গুমের বিষয়ে তিনি বলেন, নথিভুক্ত গুমের সংখ্যা ৬৮৪টি। পাশাপাশি ‘মায়ের ডাক’ ও ‘অধিকার’-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে নিবন্ধিত গুমের সংখ্যা প্রায় ৭০৯টি।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে দাখিল করা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জনকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২ হাজার ৬৩০ জন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ২ হাজার ৬৯৩ জন নিহত হয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ২ হাজারের বেশি।
তিনি বলেন, নিহতদের অধিকাংশই সামরিক রাইফেল ও শটগান থেকে ছোড়া প্রাণঘাতী গুলিতে মারা যান, যা সাধারণত দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সদস্যদের সরকারের সমালোচনা না করে পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্যাতন ও গুমসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সাবেক ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ও বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম এবং শতাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ গঠন করেছে।
বেনজীরকে ফেরাতে সরকারের উদ্যোগ
উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন দুবাইয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়।
গত ১৪ জুন সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে হবে।
এরপর গত ২০ জুন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাবেক আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পন্ন করতে বাংলাদেশকে ৩০ দিন সময় দিয়েছিল। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদ করে মাত্র তিন দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠায়।
আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, কুমিল্লা-১১ আসনের সদস্য ও বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক:
এ্যাডভোকেট মিঞা মোঃ শিরণ আলম
নিবার্হী সম্পাদক: মোঃ শাহ আলম মন্ডল
বার্তা সম্পাদক: ১। মোঃ মঈনুল ইসলাম
২। মোঃ হানিফুর রহমান
মফস্বল সম্পাদক: মোঃ হাসিন ইশরাক সরকার
অফিস:
ঘাটপাড়, বিরামপুর,দিনাজপুর
ইমেইল:birampurbd26@gmail.com
মোবাইল: সম্পাদক ও প্রকাশক: 01716-559608
নির্বাহী সম্পাদক: 01715-778350
Copyright © 2026 Birampurbd